বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:৫৯ অপরাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম
এবার আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ফাইনাল খেলা রংপুরে ৪ জনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে: ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক কমলাপুরে যাত্রীর পকেটে ছিনতাইয়ের চেষ্টা, আটক এক বিমানবন্দর এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে ৪০ জন ভবঘুরে ও ভিক্ষুককে আটক ফেনীর নুসরাত হত্যা: ২ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল, খালাস ১০ ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার রুটিন প্রকাশ গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে হাম সন্দেহে ৫ জনের মৃত্যু জনস্বার্থের বাইরে বিএনপি কোনো কাজ করবে না : ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে কমিটি গঠনের নির্দেশ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নাগরিকদের অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব : আইনমন্ত্রী

লিবিয়ায় নৃশংস হত্যাকান্ডে ২৬ বাংলাদেশী নিহত ঘটনার সাথে জড়িত চক্রের মূলহোতা গ্রেফতার

  • আপডেট সময় সোমবার, ১ জুন, ২০২০, ১১.০৬ পিএম
  • ২৯৯ বার পড়া হয়েছে

অবৈধভাবে ইউরোপে প্রেরণকালে সম্প্রতি লিবিয়ার মিজদাহ শহরে গত ২৮ মে ২০২০ তারিখে নৃশংস হত্যাকান্ডে ২৬ বাংলাদেশী নিহত এবং ১১ বাংলাদেশী মারাত্মক ভাবে আহত ঘটনার সাথে জড়িত চক্রের অন্যতম ০১ জন মূলহোতাকে রাজধানীর শাহজাদপুর, গুলশান এলাকা থেকে গ্রেফতার। সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশে বাংলাদেশী শ্রমিকদের সুনাম ও চাহিদার প্রেক্ষিতে বিপুল পরিমাণ জনশক্তি বিদেশে রপ্তানী হচ্ছে। তাদের কষ্টার্জিত আয় আমাদের অর্থনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এ সুযোগে বাংলাদেশের এক শ্রেনীর অসাধু দালাল চক্র স্বল্প আয়ের মানুষদের প্রলোভন দেখিয়ে আন্তর্জাতিক চক্রের যোগসাজসে বিদেশে অবৈধভাবে প্রেরণ করছে। এ ধরনের প্রতারণার শিকার সাধারণ নিরীহ জনগণ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মানবেতর জীবন যাপন করছে। এদের অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ পথে বিদেশ গমনের পূর্বেই মৃত্যুর মুখে পতিত হচ্ছে। এছাড়াও অবৈধভাবে বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশী নৃশংস হত্যাকান্ডের মত ঘটনার শিকার হচ্ছে। এ ধরনের গর্হিত অপরাধের সাথে যুক্তদের আইনের আওতায় আণয়ন ও তাদের মূল উৎঘাটনের লক্ষ্যে র‌্যাব সর্বদা সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে। আপনারা নিশ্চয় অবগত হয়েছেন যে, সাম্প্রতিক সময়ে গত ২৮ মে ২০২০ তারিখে লিবিয়ায় মিজদাহ শহরে নৃশংস হত্যাকান্ডে ২৬ বাংলাদেশী নিহত এবং ১১ বাংলাদেশী মারাত্মকভাব আহত হয়। এই বর্বরচিত ঘটনায় মূল উৎঘাটন করতে গিয়ে দেখা যায় যে, অবৈধভাবে ইউরোপে গমনের জন্য বিভিন্ন দালাল চক্র ইউরোপে উন্নত জীবনের মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে প্রতিনিয়ত অসহায় বাংলাদেশীদের অবৈধভাবে নৌ-পথ এবং দুর্গম মরুপথ দিয়ে প্রেরণ করে আসছে। এই অবৈধ অভিবাসীদের দুর্র্বলতার সুযোগ নিয়ে জিম্মি করে প্রতিনিয়ত মুক্তিপণদাবী এবং শারীরিক নির্যাতন করে আসছে। উল্লেখিত প্রাণহানীর ঘটনায় আন্তর্জাতিক ও দেশী মিডিয়ায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। বর্ণিত ঘটনার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে ভিকটিমদের আত্নীয়স্বজন কর্তৃক রাজৈর থানা, মাদারীপুর ও ভৈরব থানা, কিশোরগঞ্জে মানবপাচার বিরোধী আইনে ২টি মামলা রুজু হয়েছে।

উল্লেখিত ঘটনার প্রেক্ষিতে র‌্যাব-৩ ছায়া তদন্ত শুরু করে এবং গোয়েন্দা নজরদারী বৃদ্ধি করে। এরই ধারাবাহিকতায় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অদ্য ০১ জুন ২০২০ তারিখ ০৫০০ ঘটিকার সময় র‌্যাব-৩ এর আভিযানিক দল খিলবাড়ীরটেক, বরইতলা বাজার, শাহজাদপুর, গুলশান-২, ডিএমপি, ঢাকা হতে আসামী মোঃ কামাল উদ্দিন @ হাজী কামাল (৫৫), পিতা-মৃত জামাত আলী মন্ডল, থানা ও জেলা-কুষ্টিয়াকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। গ্রেফতারকৃত আসামীকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় যে, সে মিথ্যা আশ্বাস প্রদান করে বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রলোভন দেখিয়ে দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর যাবত এই অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত আছে মর্মে স্বীকার করে। এই সংঘবদ্ধ চক্রটি বিদেশী চক্রের যোগসাজসে অবৈধভাবে বাংলদেশী নাগরিকদের বিভিন্ন দেশে প্রেরণ করে আসছে। এই সিন্ডিকেটটি নিম্মোক্তভাবে ৩ টি ধাপে কাজগুলো করতো বলে জানা যায়ঃ

ক। বিদেশে গমনেচ্ছুক নির্বাচন।
খ। বাংলাদেশ হতে লিবিয়ায় প্রেরণ।
গ। লিবিয়া হতে ইউরোপ প্রেরণ।

বিদেশে গমন ইচ্ছুক নির্বাচন ঃ বিদেশে গমনেচ্ছুক নির্বাচনকালে এই চক্রের দেশীয় এজেন্টরা প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্বল্প আয়ের মানুষদের অল্প খরচে উন্নত দেশে গমনের প্রলোভন দেখিয়ে আকৃষ্ট করে থাকে। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় অনেকেই তাদের প্রস্তাবে সাড়া দেয়। এই বিদেশ গমনেচ্ছুকদের বিদেশে গমনের ক্ষেত্রে পাসপোর্ট তৈরি, ভিসা সংগ্রহ, টিকেট ক্রয় ইত্যাদি কার্যাবলী এই সিন্ডিকেটের তত্ত্ববধানে সম্পন্ন হয়ে থাকে। পরবর্তীতে তাদেরকে এককালীন বা ধাপে ধাপে কিস্তি নির্ধারণ করে ইউরোপের পথে পাড়ি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সিন্ডিকেটের সদস্যরা প্রার্থীদের সামর্থ অনুযায়ী ধাপ নির্বাচন করে থাকে। ইউরোপ গমনের ক্ষেত্রে তারা ৭-৮ লক্ষ টাকার অধিক অর্থ নিয়ে থাকে; তন্মধ্যে ৪,৫০,০০০.০০-৫,০০,০০০.০০ টাকা লিবিয়ায় গমনের পূর্বে এবং বাকি ২.৫-৩ লক্ষ টাকা লিবিয়ায় গমনের পর ভিকটিমের আত্নীয় স্বজনের নিকট থেকে নেয়।

বাংলাদেশ হতে লিবিয়ায় প্রেরণঃ বাংলাদেশ হতে লিবিয়ায় প্রেরনের ক্ষেত্রে এই চক্রের সদস্যরা বেশ কয়েকটি রুট ব্যবহার করে থাকে। উক্ত রুটগুলো তারা সুযোগ সুবিধা অনুযায়ী মাঝে মধ্যে পরিবর্তন অথবা নতুন রুট নির্ধারণ করে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে লিবিয়াতে প্রেরনের ক্ষেত্রে যে রুটটি ব্যবহার হয়ে আসছে বলে জানায়ঃ

বাংলাদেশ-কলকাতা-মুম্বাই-দুবাই-মিশর-বেনগাজী-ত্রিপলী (লিবিয়া)

দুবাইয়ে পৌঁছে তাদেরকে বিদেশী এজেন্টদের তত্ত্বাবধানে ৭/৮ দিন অবস্থান করানো হয়ে থাকে। বেনগাজীতে প্রেরণের লক্ষ্যে বেনগাজী হতে এজেন্টরাকথিত “মরাকাপা” নামক একটি ডকুমেন্ট দুবাইতে প্রেরণ করে থাকে। যা দুবাইয়ে অবস্থানরতবিদেশী এজেন্টদের মাধ্যমে ভিকটিমদের নিকট হস্তান্তর করা হয়। অতঃপর উক্ত ডকুমেন্টসহ বিদেশী এজেন্ট তাদেরকে মিশর ট্রানজিট নিয়ে বেনগাজী লিবিয়ায় প্রেরণ করে। বেনগাজীতে বাংলাদেশী এজেন্ট তাদেরকে বেনগাজী হতে ত্রিপলীতে স্থানান্তর করে।

লিবিয়া হতে ইউরোপ প্রেরণঃ ভিকটিমরা ত্রিপলীতে পৌঁছানোর পর ত্রিপলীতে অবস্থানরত বাংলাদেশী কথিত কয়েকজন এজেন্ট তাদের গ্রহণ করে থাকে। তাদেরকে ত্রিপলীতে বেশ কয়েকদিন অবস্থান করানো হয়। অতঃপর ত্রিপলীতে অবস্থানকালীন সময়ে বর্ণিত এজেন্টদের দেশীয় প্রতিনিধির দ্বারা ভিকটিমদের আত্নীয়স্বজন হতে অর্থ আদায় করে থাকে। অতঃপর ভিকটিমদের ত্রিপলীর বন্দর এলাকায় একটি সিন্ডিকেট নিকট অর্থের বিনিময়ে ইউরোপে পাচারের উদ্দেশ্যে তাদেরকে হস্তান্তর করা হয়। উক্ত সিন্ডিকেটতাদের একটি নির্দিষ্ট স্থানে রেখে থাকে। অতঃপর উক্ত সিন্ডিকেট সমুদ্রপথে অতিক্রম করার জন্য নৌ-যান চালনা এবং দিক নির্ণয়যন্ত্র পরিচালনা সহ আনুসাঙ্গিক বিষয়ের উপর নানাবিধ প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। একটি নির্দিষ্ট দিনে ভোর রাতে এক সঙ্গে কয়েকটি নৌ-যান লিবিয়া হয়ে তিউনেশিয়া উপকূলীয় চ্যানেলের হয়ে ইউরোপের পথে রওনা দেয়। এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পথে গমনকালে ভিকটিমরা ভূমধ্যসাগরের মাঝে মধ্যেই দূর্ঘটনার শিকার হয় এবং জীবনাবসানের ঘটনা ঘটে থাকে।

বর্ণিত হত্যাকান্ডের ঘটনায় নিহত ও আহত বাংলাদেশীরা বৃহত্তর মাদারীপুর, শরীয়তপুর, কিশোরগঞ্জ ও মাগুরার বাসিন্দা বলে জানা যায়। তারা বেশ কয়েকটি চক্রের মাধ্যমে অবৈধপথে ইউরোপে গমনাগমনের জন্য প্রতারনার শিকার হয়েছে। গোয়েন্দা সূত্রে বেশ কয়েকটি সিন্ডিকেটের সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গিয়েছে।

গ্রেফতারকৃত মোঃ কামাল উদ্দিন @ হাজী কামাল (৫৫) এই কুখ্যাত দালাল চক্রের অন্যতম মূলহোতা। সে গত ১০ থেকে ১২ বছর ধরে অবৈধভাবে লিবিয়াতে প্রায় ৪০০ বাংলাদেশীকে প্রেরণ করেছে। লিবিয়া ছাড়াও সে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবৈধ প্রক্রিয়ায় অভিবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।এছাড়াও সে একজন টাইলস্ কনট্রাক্টর। প্রচুর পরিমানে টাইলস শ্রমিক তার সংস্পর্শে আসে। এ সুযোগে সে তাদেরকে প্রলুব্ধ করে যে, বাংলাদেশে তোমরা ৫০০-৮০০ টাকা আয় করতে পারো কিন্তু লিবিয়াতে গেলে তোমরা প্রতিদিন ৫০০০-৬০০০ টাকা আয় করতে পারবে এবং লিবিয়াতে টাইলস মিন্ত্রিদের অনেক চাহিদা। সে আরোও বলে লিবিয়াতে যাওয়ার পূর্বে মাত্র ১,০০,০০০/-টাকা আমাকে দিবে এবং বাকি ৪,০০,০০০/-টাকা লিবিয়াতে পৌঁছানোর পরে তোমার পরিবার আমাকে দিবে। এই রুপ ফাঁদে ফেলে শ্রমিকদের বিদেশে প্রেরণ করে। অতঃপর উক্ত শ্রমিকরা লিবিয়াতে পৌঁছানোর পরে সেখানে অবস্থান করা অন্যান্য পাচারকারী দলের সদস্যরা ভিকটিমদের জিম্মি করে অতিরিক্ত টাকা দাবী এমনকি শারীরিক নির্যাতন করে। সেই নির্যাতনের ভিডিও ভিকটিমদের পরিবারের নিকট প্রেরণ করে। এমনকি সরাসরি মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে যার কারনে ভিকটিমদের পরিবার জীবন বাচাঁনোর জন্য পাচারকারী দলের চাহিদা মোতাবেক টাকা প্রেরণ করতে বাধ্য হয়। অবৈধ প্রক্রিয়ায় এ অভিবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে গিয়ে দালাল চক্র/পাচারকারী দল সাগর মহাসাগর পার হতে গিয়ে কোন কোন শ্রমিকের সলিল সমাধি ঘটে আবার কিছু শ্রমিকদের নিয়ে বিভিন্ন গহীন জঙ্গলে অর্ধাহারে অনাহারে থেকে মানবতার জীবন যাপন করে সেখানকার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক গ্রেফতার হয়। যা জাতীয় ও আন্তজার্তিক পরিমন্ডলে দেশ এবং সরকারের ভাবমূর্তি ব্যাপক ভাবে ক্ষুন্ন করে। র‌্যাব দীর্ঘদিন যাবৎ এই মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে আসছিল তারই ধারাবাহিকতায় অদ্য মোঃ কামাল উদ্দিন @ হাজী কামাল (৫৫) কে খিলবাড়ীরটেক এলকা হতে গ্রেফতার করা হয়। এই চক্রের সাথে জড়িতদের সম্পর্কে র‌্যাব ব্যাপক তথ্য উদঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2022 songbadsarakkhon.com
Theme Developed BY ThemesBazar.Com