বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:৫৩ অপরাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম
সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ৩০ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য দুর্নীতির ১৫ মামলায় খালাস পেলেন মির্জা আব্বাস সারাদেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে ৫ শিশুর মৃত্যু ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে ৩৩২ জন মারা গেছেন বলে জানিয়েছে নেপাল পুলিশ গুমের মামলায় জিয়াউল আহসানকে গ্রেফতার দেখিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল নেপালকে সব ধরনের সহায়তা দিতে প্রস্তুত বাংলাদেশ : পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ দলনিরপেক্ষভাবে কাজ করব : রাষ্ট্রপতি ৪০ ভবঘুরে ও ভিক্ষুককে আটক করেছে বিমানবন্দর থানা পুলিশ পাহাড়ধসের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাঁশখালীতে ৪২০ পরিবার পেল নগদ সহায়তা নেছারাবাদে ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে ছারছীনা দরবারের বিশাল আনন্দ মিছিল১১

গণভোট, প্যাকেজ প্রচারণা ও সংস্কারের রাজনীতি

  • আপডেট সময় শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী, ২০২৬, ১০.০৫ এএম
  • ৭৫ বার পড়া হয়েছে

তাইফুর বায়জীদ আখন্দঃ- এই গণভোট কি জনগণের মতামত নেওয়ার প্রক্রিয়া, নাকি একটি পূর্বনির্ধারিত রাষ্ট্র-কাঠামো বৈধ করার আয়োজন?

অভ্যুত্থান–পরবর্তী বাংলাদেশে রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য প্রস্তাবিত গণভোট কেবল একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়। এটি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার কাঠামো নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল প্রস্তাবিত প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো আলাদাভাবে, স্পষ্টভাবে ও নিরপেক্ষভাবে জনগণের সামনে উপস্থাপন করা—যাতে মানুষ বুঝে–শুনে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
কিন্তু ‘প্যাকেজ সংস্কার’ আকারে ভোটারদের সামনে তুলে ধরা প্রস্তাবগুলো স্বচ্ছতা ও রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতার আন্তর্জাতিক ও আইনি মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

“সংস্কার দরকার। ঐকমত্য দরকার।
কিন্তু তার আগে দরকার স্বচ্ছতা, পৃথক প্রশ্ন,
এবং জনগণের বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার প্রতি পূর্ণ সম্মান।”

প্রচারণার ভাষা ও বিভ্রান্তি

‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারিত বার্তায় বলা হচ্ছে—‘হ্যাঁ’ দিলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা, শক্তিশালী বিরোধী দল, উচ্চকক্ষ এবং নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি কার্যকর হবে।
অন্যদিকে ভয় দেখানো হচ্ছে—‘না’ ভোট দিলে এগুলোর কোনোটিই বাস্তবায়িত হবে না।

সংবিধান অনুযায়ী এই দাবি ভিত্তিহীন। সংসদ যেকোনো সময় সংবিধান সংশোধন ও আইন প্রণয়ন করতে পারে।

একইভাবে ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারণাও নিরাপত্তা ও আবেগের আশ্রয় নিচ্ছে—সংবিধানে বিসমিল্লাহ থাকবে, একাত্তরের ইতিহাস বিকৃত হবে না, গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা পাবে।
ফলশ্রুতিতে প্রকৃত বিতর্ক—সংবিধান, প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্ন—প্রচারণার আবেশে চাপা পড়ে যাচ্ছে।

সমস্যা কোথায়—সংস্কারের বিষয়বস্তু, নাকি গঠনপ্রক্রিয়া?

জুলাই সনদের বিতর্ক মূলত সংস্কার দরকার কি না—সে প্রশ্ন নয়; বরং সংস্কার কীভাবে হবে এবং কার নিয়ন্ত্রণে হবে—এই দ্বন্দ্বকে সামনে আনে।

‘জুলাই সনদ’-এর অনেক প্রস্তাবে রাজনৈতিক ঐকমত্য থাকলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিভিন্ন দল ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—দ্বিকক্ষ সংসদ, সংসদীয় কমিটি, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ কাঠামো, নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির পদ্ধতি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, পিএসসি, দুদক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের গঠনপ্রক্রিয়া।

বিশেষ করে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রস্তাবিত কাঠামো বিশ্লেষণ করলে অস্বাভাবিক চিত্র দেখা যায়। প্রস্তাব অনুযায়ী ৭ সদস্যের কমিটিতে ৫ জনই হবেন বিরোধী দল থেকে, সরকারি দল থেকে থাকবেন মাত্র ২ জন—স্পিকার ও হুইপ। বিরোধী দল থেকে থাকবেন ডেপুটি স্পিকার, বিরোধী দলের হুইপ। তৃতীয় বৃহৎ দলের একজন প্রতিনিধি এবং দুইজন সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি—এ ক্ষেত্রেও সভাপতি হতে হবে বিরোধী দল থেকে।

অর্থাৎ, যারা সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পাবে, তাদের হাত বেঁধে রাখার এক অদ্ভুত কাঠামো এটি। কোনো রাজনৈতিক দল কি চাইবে—সরকারে থেকেও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান গঠনে তারা কার্যত ক্ষমতাহীন থাকুক?
এটি অনেকটা সেই প্রতিযোগিতার মতো, যেখানে প্রথম হওয়া ব্যক্তি পায় রৌপ্যপদক, আর দ্বিতীয় হওয়া ব্যক্তি পায় স্বর্ণপদক।

এই কাঠামোতেই কয়েকটি দল আপত্তি জানিয়েছে। তবু গণভোটে এসব আপত্তিকৃত বিষয়কেও ঐকমত্যের প্রস্তাবগুলোর সঙ্গে একত্র করে ‘প্যাকেজ’ হিসেবে হাজির করা হয়েছে।

রাষ্ট্র ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভূমিকা

সরকারি অফিস-আদালত, ব্যাংক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারি অর্থ ব্যয় করে একতরফাভাবে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণা চলছে।
এই প্রশ্ন এড়ানো যায় না—একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কি গণভোটে কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের হয়ে দাঁড়াতে পারে?

বিশেষ করে যখন প্রধান উপদেষ্টা ও অন্যান্য উপদেষ্টারা নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সরে এসে প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের অনুরোধ করেন, তখন নৈতিকতা ও রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

এত জোরালো ও একতরফা প্রচারণা সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি করাই স্বাভাবিক—এর পেছনে অন্য কোনো অঘোষিত রাজনৈতিক লক্ষ্য কাজ করছে কি না। রাজনৈতিকভাবে এটি সরকারের জন্য ‘বুমেরাং’ হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করে।

গণভোট কি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রত্যাশিত কাঠামো?

প্রশ্ন জাগে—যাঁরা নিজেরাই জানেন যে তাঁরা এখন ক্ষমতায় আসতে পারবেন না, তাঁরা কি গণভোটকে ব্যবহার করে এমন একটি কাঠামো স্থায়ী করতে চাইছেন, যেখানে সরকার বদলালেও প্রকৃত ক্ষমতা থাকবে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে—সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ কাঠামোর মাধ্যমে?

তাহলে এই গণভোট জনগণের মতামত নেওয়ার আয়োজন নয়, বরং জনগণের কাঁধে দায় চাপিয়ে একটি পূর্বনির্ধারিত নকশা অনুমোদন করিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় পরিণত হতে পারে।

জুলাই সনদ ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার কাঠামো নির্ধারণের প্রশ্ন। এই সনদে কিছু প্রস্তাব নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। আবার কিছু প্রস্তাব বিতর্কিত, অস্পষ্ট এবং সাংবিধানিক ভারসাম্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

বাংলাদেশে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণ কেবল একটি সরকার নয়, চাপিয়ে দেওয়া ক্ষমতাকেন্দ্রিক সংস্কৃতিকেও প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য জীবন দেয়নি।

সেই জায়গা থেকে যদি আবার জনগণের সামনে ‘প্যাকেজ সংস্কার’ ধরিয়ে দেওয়া হয়, তবে তা গ্রহণযোগ্যতা পাবে কি না—এই প্রশ্ন অনিবার্য।

রাষ্ট্র সংস্কার যদি সত্যিই জনগণের জন্য হয়, তবে তা হতে হবে জনগণের বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার ওপর দাঁড়িয়ে—স্বচ্ছতা, পৃথক প্রশ্ন ও নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে। প্যাকেজ চাপিয়ে দিয়ে নয়।

#Referendum #BangladeshPolitics #StateReform #ConstitutionalReform #JulyCharter #PoliticalReform #Democracy #RuleOfLaw #InstitutionalReform #InterimGovernment #Governance #PublicWill #PoliticalAnalysis #ElectoralReform #SeparationOfPowers #Transparency #StateNeutrality #CivilRights #DemocraticProcess #Bangladesh

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2022 songbadsarakkhon.com
Theme Developed BY ThemesBazar.Com