মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩২ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম
ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীতে ৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড ডে মিলের দুধ খেয়ে হাসপাতালে ৩৪ শিক্ষার্থী ভর্তি পিরোজপুরে জিয়া মঞ্চের ৩৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শোভাযাত্রা গভীর নলকূপ নিয়ে বিরোধ, হামলা ও হুমকির অভিযোগ লক্ষ্মীপুরে নিরাপত্তাহীনতায় জাকির হোসেনের পরিবার ভাঙ্গা বাজারে দোকানের টিন কেটে দুই দোকানে চুরি নগদ টাকাসহ মালামাল লুট,ব্যবসায়িরা আতংকে ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুরের ভাতুড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদ ও কমিউনিটি নেতৃবৃন্দের সাথে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত প্যান্টের পকেটে সোনা লুকিয়ে এনে শাহ আমানতে ধরা এক যাত্রী খিলক্ষেতে ইয়াবা তৈরির ঘাঁটিতে পুলিশের হানা, মাদকসহ মেশিন-কাঁচামাল উদ্ধার,আটক ১ চট্টগ্রামের গণপরিবহনে চরম অনিয়ম-ভোগান্তি: প্রশাসনের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন” এসআরবির যাত্রা শুরু, সদস্যদের স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিতের নির্দেশ কাউকে দুর্নীতি করতে দেওয়া হবে না: লক্ষ্মীপুরে বনমন্ত্রী

গণভোটের মাধ্যমে দায় স্থানান্তর

  • আপডেট সময় বুধবার, ২১ জানুয়ারী, ২০২৬, ৬.০২ পিএম
  • ৭৯ বার পড়া হয়েছে

তাইফুর বায়জীদ আখন্দঃ- খনো কখনো সরকার প্রকৃত সংস্কার প্রক্রিয়া এড়িয়ে গিয়ে গণভোটের পথে হাঁটে। এর মূল লক্ষ্য থাকে সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক দায়ভার নিজের কাঁধ থেকে সরিয়ে ‘জনতার’ওপর চাপিয়ে দেওয়া। প্রস্তাবিত ‘জুলাই সনদ’-এর ক্ষেত্রেও এমন ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই সনদে কিছু প্রস্তাব নিঃসন্দেহে ইতিবাচক; আবার কিছু প্রস্তাব অত্যন্ত বিতর্কিত, অস্পষ্ট এবং সাংবিধানিক ভারসাম্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। অথচ গণভোটের কাঠামো এমন যে, এখানে নাগরিককে পুরো নথির পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নিতে বাধ্য করা হয়। গণভোট তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন প্রশ্নটি একক, স্পষ্ট ও সর্বসাধারণের জন্য বোধগম্য।

ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার এ কারণেই সতর্ক করে বলেছিলেন, “Referendums are a device of dictators and demagogues.” অর্থাৎ, গণভোট অনেক সময় জনগণের ক্ষমতায়নের চেয়ে দায় এড়ানোর হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

ফলে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে ভালো প্রস্তাবের সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ প্রস্তাবগুলোও বৈধতা পেয়ে যাবে। অন্যদিকে ‘না’ জয়ী হলে সমাজ ও রাজনীতিতে যেসব বিষয়ে ইতিমধ্যে ব্যাপক ঐকমত্য রয়েছে, সেগুলো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আলাদাভাবে বিল আকারে সংসদে উত্থাপন করে আলোচনা, সংশোধন ও যুক্তিতর্কের মধ্য দিয়ে পাশ করতে হবে। অর্থাৎ ‘না’ ভোট এখানে অগ্রগতির প্রতিবন্ধক নয়; বরং সুস্থ, দায়িত্বশীল ও বাছাইকৃত সংস্কারের পথ খুলে দেয়।

রাজনৈতিক তাত্ত্বিক আলেক্সিস দ্য টকভিল বহু আগেই সতর্ক করেছিলেন, “The tyranny of the majority is the greatest danger of democratic governments.” জুলাই সনদের মতো বহুস্তরবিশিষ্ট সাংবিধানিক নথিকে গণভোটে তোলা সেই ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরাচার’-এর ঝুঁকিকেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। ইউরোপ কাউন্সিলের ভেনিস কমিশনও তাদের বিভিন্ন মতামতে বলেছে, বহু-বিষয়ক সাংবিধানিক প্যাকেজ গণভোটে তোলা গণতান্ত্রিক মানদণ্ডের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

জুলাই সনদের ক্ষেত্রেও আরেকটি বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে। ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলেও পরবর্তী সংসদ যে সনদের সব প্রস্তাব কার্যকর করবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। অনেক প্রস্তাবের ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক দলগুলোর ‘Note of Dissent’ বা ভিন্নমত রয়েছে। কিন্তু গণভোটে একবার ‘হ্যাঁ’ জিতে গেলে পরবর্তী সংসদের গঠনমূলক সমালোচনাকেও সহজেই ‘জনরায়ের বিরোধিতা’হিসেবে তকমা দেওয়া যাবে। ফলে সংসদীয় বিতর্ক ও সংশোধনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে জনগণের চোখে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে উপস্থাপনের একটি রাজনৈতিক ফাঁদ তৈরি হবে।

আরও বড় সমস্যা হলো, দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ জুলাই সনদটি সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নন। যারা পড়েছেন, তাঁদের অনেকের পক্ষেও এর সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় প্রভাব অনুধাবন করা কঠিন। রাষ্ট্রকাঠামো ও ক্ষমতার ভারসাম্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা না থাকলে এই নথিটির গভীর অর্থ বোঝা প্রায় অসম্ভব। জেমস ম্যাডিসন এ কারণেই সতর্ক করে বলেছিলেন, সরাসরি গণতন্ত্র প্রায়ই আবেগ ও বিভ্রান্তির শিকার হয়। এমন বাস্তবতায় গণভোট প্রকৃত অর্থে ‘সচেতন জনমত’-এর প্রতিফলন না হয়ে আবেগ, প্রচারণা ও আস্থার সংকটের প্রতিফলন হয়ে ওঠার আশঙ্কাই বেশি।

এ ধরনের ঝুঁকির উজ্জ্বল উদাহরণ হলো ‘ব্রেক্সিট’। ২০১৬ সালে যুক্তরাজ্যে একটি অত্যন্ত জটিল অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় প্রশ্নকে ‘থাকব না যাব’—এই সরল হ্যাঁ–না কাঠামোয় নামিয়ে আনা হয়েছিল। ফলাফল হিসেবে দেশটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অচলাবস্থা, সামাজিক বিভাজন ও আস্থার সংকটে পড়ে। ব্রেক্সিট প্রমাণ করেছে, জটিল সিদ্ধান্ত গণভোটে তুললে তা সমাধানের চেয়ে সংকটই বেশি তৈরি করে।

এই প্রেক্ষাপটে জুলাই সনদের মতো নথির প্রকৃত গণতান্ত্রিক পথ হওয়া উচিত বহু-বিষয়ক গণভোট নয়; বরং নির্বাচিত সংসদে ধারাবাহিক, উন্মুক্ত ও সংশোধনযোগ্য বিতর্কের মাধ্যমে প্রস্তাবগুলো বিবেচনা করা। রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো কোনো একদিনের ‘হ্যাঁ-না’ রায়ের বিষয় নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ। যা দাবি করে দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্বশীল রাজনীতি—দায় স্থানান্তর নয়।

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2022 songbadsarakkhon.com
Theme Developed BY ThemesBazar.Com