সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫২ অপরাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম
সরকার গঠনের আট মাসের মধ্যে পদত্যাগ করেছেন বিএনপি সরকারের তিন মন্ত্রী- প্রতিমন্ত্রী বলিউড অভিনেতা টাইগার শ্রফ বেঁচে গেলেন, পয়েন্ট ব্লাঙ্ক রেঞ্জে বন্দুক জ্যাম! গত ২৪ ঘণ্টায় মশাবাহিত ডেঙ্গু রোগে ৪ জনের মৃত্যু মন্ত্রিসভা থেকে ইশরাকের আনুষ্ঠানিক পদত্যাগ ডিএমপির অভিযানে গত ২৪ ঘণ্টায় গ্রেফতার ৪৮৪, মামলা ৫৩ ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনে গত ২৪ ঘন্টায় ডিএমপির ২০১৭ মামলা ৭ জানুয়ারি, বৃহস্পতিবার অমর একুশে বইমেলা-২০২৭ শুরু হবে নিজের সন্তানের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর পরিবেশ, একটি স্বাস্থ্যকর শহর গড়ে তুলি :প্রধানমন্ত্রী ‘মহাঅষ্টমী’ সারাদেশে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হচ্ছে স্বৈরাচারের ফেরার পথ খুলে দেয়া হবে জুলাই ও মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের সঙ্গে গাদ্দারি : প্রধানমন্ত্রী

গণঅভ্যুত্থান, জেন-জি ও বর্তমান বাস্তবতা: আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে ?

  • আপডেট সময় বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫, ৯.৫৯ পিএম
  • ১৫০ বার পড়া হয়েছে

তাইফুর বায়জীদ আখন্দঃ- বাংলাদেশ আজ এক গভীর আত্মপর্যালোচনার মুহূর্তে দাঁড়িয়ে। গণঅভ্যুত্থানের পর যে রাষ্ট্র মেরামতের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, বাস্তবে তার কতটা বাস্তবায়ন ঘটছে—এই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে জরুরি।

এই প্রেক্ষাপটে নেপালের সাম্প্রতিক গণআন্দোলন এবং আমাদের অভিজ্ঞতার তুলনা অনিবার্য হয়ে উঠেছে। নেপালের জেনারেশন-জি (Gen Z) গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার পথে হাঁটেনি; বরং তারা দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রকে নতুন করে দাঁড় করানোর সুযোগ তৈরি করেছে। জানমালের ক্ষতির জন্য জনগণের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া, যেখানে সহিংসতা হয়েছে সেখানে পরিষ্কার করার আহ্বান, এবং সর্বোপরি দ্রুত নির্বাচনের দাবিতে আবার পড়ার টেবিলে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত—এসবই প্রমাণ করে যে তাদের আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল রাষ্ট্র, ক্ষমতা নয়।

নেপালে সংসদ সদস্যদের ওপর হামলা ও অপমানের ঘটনা ঘটেছে—এটা সত্য। কিন্তু যে জাতি যত দ্রুত উত্তেজিত হয়েছে, ঠিক তত দ্রুতই তারা সংযত হয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণের কাজে মনোযোগী হয়েছে। এই আত্মনিয়ন্ত্রণই একটি গণতান্ত্রিক সমাজের শক্তি।

ক্ষমতার মোহ ও অস্থিরতার রাজনীতি

এর বিপরীতে, বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতা গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। জেন-জি প্রতিনিধিদের একটি অংশ অতি দ্রুত ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে গেছে। আজ সচিবালয়ে এমন দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, যেখানে অভিজ্ঞ সিনিয়র সচিবদের জেন-জি প্রতিনিধিদের সামনে ‘জি স্যার’ বলতে হচ্ছে। এই চিত্র সাধারণ মানুষকে শুধু হতাশই নয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কিতও করছে।

গণঅভ্যুত্থানের পরপরই দেশে শুরু হয়েছে লাগাতার মব ভায়োলেন্স, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা মামলা, চাঁদাবাজি এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের জিম্মি করে অর্থ আদায়ের উৎসব। আরও ভয়ংকর বিষয় হলো—কুৎসিত ও অশ্লীল ভাষাকে প্রতিবাদের নতুন ভাষা হিসেবে স্বাভাবিক করে তোলার অপচেষ্টা।

একজন নারী বীর মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে সামাজিক মাধ্যমে বাহবা পাওয়া ব্যক্তি পরবর্তীতে চাঁদাবাজির অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন—এই ঘটনাই বলে দেয়, আমরা কোন পথে হাঁটছি। এটাই কি সেই বাংলাদেশ, যার স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল?

বিচারের নামে কী চলছে?

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দিকে তাকালেই প্রশ্নের পর প্রশ্ন উঠে আসে। বিচারক, আসামিপক্ষের আইনজীবী এবং ভুক্তভোগী বাদীপক্ষ—সবাই যখন একই রাজনৈতিক বলয়ের মানুষ হন, তখন বিচার নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।

আইজিপি মামুনের হঠাৎ রাজসাক্ষী হয়ে যাওয়া এবং একটি নির্দিষ্ট ল-ফার্মের মাধ্যমে তাকে আইনি সহায়তা দেওয়ার ঘটনাও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এখানে কি একজন রাজসাক্ষীকে ‘উদ্ধার’ করা হচ্ছে, নাকি তাকে ব্যবহার করে অন্য কাউকে আড়াল করা হচ্ছে? প্রশ্নগুলো সহজ, কিন্তু সম্ভাব্য উত্তর ভয়াবহ।

বিপ্লবী সাজার প্রতিযোগিতা

আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো—জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোতে যাদের মাঠে তেমন কোনো বাস্তব উপস্থিতি ছিল না, তারাই আজ সবচেয়ে বড় বিপ্লবী সেজে সামনে চলে এসেছেন। যারা সত্যিকার অর্থে রাস্তায় লড়াই করেছে, তারা আজ তুলনামূলকভাবে সংযত। অথচ সুযোগসন্ধানীরা এখন বিপ্লবের ট্রেন ধরতে মরিয়া।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস সবাইকে নিয়ে জাতীয় ঐক্যের স্বপ্ন দেখার বদলে নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে যে পথ বেছে নিয়েছেন, তা দেশকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সংস্কার ও বিচারের নামে কি আদতে কেবল সময়ক্ষেপণই হচ্ছে—এই প্রশ্নও এখন জোরালো।

অতীত ও বর্তমানের তুলনা

শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ ছিল নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক নিপীড়ন—এগুলো নিঃসন্দেহে গুরুতর অপরাধ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তখন কি গণতন্ত্রের সব সূচক সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল?

সংসদে দাঁড়িয়ে এমপিরা প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও কঠোর সমালোচনা করেছেন। পত্রিকায় নিজ দলের এমপিরাই সরকারের চেইন অব কমান্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। টকশোতে সব রাজনৈতিক মতের মানুষ কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন। নিপীড়ন ছিল—কিন্তু আজকের মতো সর্বগ্রাসী ‘মব কালচার’ কি তখন ছিল?

আজ কয়েকজন মানুষ রাস্তায় বসেই মব তৈরি করে মানুষ পিটিয়ে মারছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান যেভাবে প্রকাশ্যে শেখ হাসিনার সমালোচনা করতেন—তার এক হাজার ভাগের এক ভাগ সমালোচনা যদি আজ কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কেউ করে, তবে তাকে রক্ষা করতে এক ব্যাটালিয়ন সৈন্যও যথেষ্ট হবে না। এটাই আজকের নির্মম বাস্তবতা।

শেষ প্রশ্ন

আমরা ফ্যাসিবাদের পতন চেয়েছিলাম একটি সুন্দর, নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের আশায়। কিন্তু যদি একজনের ফ্যাসিবাদের জায়গায় অন্য কোনো শক্তির মব ভায়োলেন্স, ভয় ও বাকস্বাধীনতাহীন পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত হয়—তবে এই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা কোথায় দাঁড়াবে?

আজ সাধারণ মানুষ প্রশ্ন করছে—এই পরিবর্তন কি সত্যিই জনগণের জন্য, নাকি কেবল গুটিকয়েক ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর ক্ষমতা ও স্বার্থ রক্ষার জন্য?

মানুষকে অপমান করে, ভয় দেখিয়ে, মব তৈরি করে টাকা কামানো যায়—এই যে শিক্ষা, এই শিক্ষাই আমাদের জেন-জি-কে সবচেয়ে বড়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

গণঅভ্যুত্থান যদি রাষ্ট্র মেরামতের বদলে নতুন ধরনের দমন-পীড়নের জন্ম দেয়, তবে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2022 songbadsarakkhon.com
Theme Developed BY ThemesBazar.Com