বিশেষ প্রতিবেদক চট্টগ্রামঃ- চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসচালিত গণপরিবহনে ভাড়া আদায়, হয়রানি, অনিয়ম, অসংগতি ও নৈরাজ্যের অভিযোগের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে ডিজেলচালিত গণপরিবহনেও শুরু হয়েছে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ। ২১ সেপ্টেম্বর নগরের বিভিন্ন রুটে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ৩ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোথাও কোথাও নতুন কোনো সরকারি ভাড়া কার্যকর হওয়ার আগেই চালক-হেলপারদের নিজেদের মতো করে ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ ও ভোগান্তি চরমে উঠেছে।
রোববার রাতে সরকার চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ায়। নতুন দরে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে। এর পরদিনই চট্টগ্রামের গণপরিবহনে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ সামনে আসে। অথচ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর বাসভাড়া সমন্বয়ের জন্য ২১ সেপ্টেম্বর বিআরটিএর বৈঠক হয়েছে এবং সেখানে দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারে ২০ পয়সা ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহানগরের বাসে ১৮ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবটি তখনও চূড়ান্ত হয়নি; পরবর্তী সরকারি প্রক্রিয়া শেষে প্রজ্ঞাপন জারির পরই নতুন ভাড়া কার্যকর হওয়ার কথা।
মাঠপর্যায়ের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। বিভিন্ন গণমাধ্যমের সরেজমিন প্রতিবেদনে ২ নম্বর গেইট থেকে আগ্রাবাদ রুটে ১৫ টাকার পরিবর্তে ২০ টাকা, মুরাদপুর থেকে আন্দরকিল্লায় ১৫ টাকার পরিবর্তে ১৮ থেকে ২০ টাকা এবং কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত ৬৮ টাকার পরিবর্তে কোনো কোনো বাসে ৮০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ এসেছে। অন্যদিকে কাজীর দেউড়ি থেকে নিউমার্কেটের মতো স্বল্প দূরত্বেও বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় যাত্রী ও চালক-হেলপারের মধ্যে বাকবিতণ্ডার ঘটনাও ঘটছে।
অভিযোগের আরেকটি গুরুতর দিক হলো—ডিজেলের দাম বাড়ার সঙ্গে গ্যাসচালিত পরিবহনেও একইভাবে বাড়তি ভাড়া আদায়ের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যাত্রীদের অভিযোগ, গ্যাস সংকটের সময় যে বাড়তি ভাড়া নেওয়া শুরু হয়েছিল, সংকট কমে যাওয়ার পরও অনেক ক্ষেত্রে তা কমানো হয়নি। সেপ্টেম্বরের শুরুতেও চট্টগ্রামে গ্যাসচালিত যানবাহনে সংকটের সময়কার বাড়তি ভাড়া অব্যাহত থাকার অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছিল।
এভাবে আইন, বিধি ও প্রশাসনিক নির্দেশনা উপেক্ষা করে চালক-হেলপার, মালিক-শ্রমিক কিংবা পরিবহনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের কেউ যদি সরকারি অনুমোদনের বাইরে নিজস্ব সিদ্ধান্তে ভাড়া নির্ধারণ করে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—সরকার ভাড়া নির্ধারণ করবে, নাকি মাঠে পরিবহনকর্মীরাই নিজেদের মতো করে ভাড়া নির্ধারণ করবেন? নতুন ভাড়ার তালিকা বা অনুমোদিত রেট চার্ট প্রদর্শন না করে যাত্রীর কাছ থেকে ইচ্ছেমতো টাকা নেওয়া হলে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করার সুযোগই বা কতটা পাচ্ছেন? প্রতিবাদ করলে দুর্ব্যবহার বা মারমুখী আচরণের অভিযোগের প্রতিকারই বা কোথায়?
চট্টগ্রামের গণপরিবহন ব্যবস্থায় এই পরিস্থিতি নতুন নয়। অতিরিক্ত ভাড়া, যাত্রী হয়রানি ও ভাড়া নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে ১০ সেপ্টেম্বর কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম বহদ্দারহাটে র্যালি ও অবস্থান কর্মসূচিও পালন করেছে। অর্থাৎ বিষয়টি নিয়ে ভুক্তভোগী যাত্রীদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান, নীতিনির্ধারক, দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ও মাঠ প্রশাসনের কাছে—সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির আগে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগে কতটি অভিযান হয়েছে? কতটি যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? অতিরিক্ত আদায় করা ভাড়া ফেরত দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা আছে কি? গ্যাস সংকটের অজুহাতে দীর্ঘদিন ধরে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগের তদন্ত কোথায় দাঁড়িয়েছে? এবং অনুমোদিত ভাড়ার চার্ট প্রদর্শন বাধ্যতামূলকভাবে নিশ্চিত করার দায়িত্ব কে পালন করছে?
জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে—এটি বাস্তবতা। কিন্তু সেই ব্যয় সমন্বয়ের বৈধ পথ হলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত প্রক্রিয়া ও সরকারি অনুমোদিত ভাড়া। সরকারি সিদ্ধান্তের আগেই যাত্রীর পকেট থেকে বাড়তি টাকা তুলে নেওয়া সেই প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এতে শুধু যাত্রী ভোগান্তিই বাড়ে না, নিরাপদ ও জনবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থার ওপরও মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
চট্টগ্রামের সাধারণ যাত্রীদের দাবি—ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় বন্ধ, প্রতিটি গণপরিবহনে অনুমোদিত ভাড়ার তালিকা দৃশ্যমানভাবে প্রদর্শন, বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা এবং দীর্ঘদিনের গ্যাসচালিত পরিবহনের ভাড়া নৈরাজ্যেরও কার্যকর তদন্ত করতে হবে। এখন ভুক্তভোগী মানুষের একটাই প্রশ্ন—গণপরিবহনের এই ভাড়া নৈরাজ্যের শেষ কোথায়, আর প্রতিকারই বা কোথায়?